শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫, ০৬:১১ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক:দেশের বাজারে এখন ভোজ্য তেল নিয়ে রীতিমতো তেলেসমাতি কারবার চলছে। বাজার থেকে সয়াবিন তেল একরকম উধাও করে দিয়েছে তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলো। এভাবে সংকট তৈরি করে লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত দামও বাড়িয়ে দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
এতে চরম বিপাকে পড়েছেন ক্রেতারা। কিন্তু শীতকাল এলেই কেন সয়াবিন তেলের দাম বাড়ে? এ প্রশ্ন ক্রেতা সাধারণের মনে।
পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী, মিল মালিক এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গরমকালে অনায়াসেই সয়াবিন তেলের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত কম দামি পাম অয়েল মিশিয়ে বিক্রি করা হয়। তবে শীতকালে বেশি পাম অয়েল মেশালে সয়াবিন তেল জমে যায়। তাই শীতে বেশি পাম অয়েল মেশানো হয় না সয়াবিনে। এ জন্য দাম বাড়ে।
মৌলভীবাজারের এক পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শীতে সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো এতে পাম অয়েল মেশানো হয় তাই জমে যায়। শীতে সয়াবিন তেল জমে গেলে ক্রেতারা বুঝে ফেলবেন যে এগুলো সয়াবিন তেল না পাম অয়েল। এ জন্য শীতে সয়াবিন তেলের মধ্যে পাম অয়েল মেশানোর হার কমাতে বাধ্য হন মিল মালিকরা। সে কারণেই সয়াবিন তেল উৎপাদনে খরচ বেড়ে যায় বলে শীতে সয়াবিন তেলের দাম বেড়ে যায়।’
তবে বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্য তেল ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. গোলাম মওলা বলেন, ‘এ রকম অভিযোগ আমরা অনেকবার শুনেছি। তবে সয়াবিন তেলে পাম অয়েল মেশানো হয় কি না বিষয়টি আমার জানা নেই। আর এ বছর সয়াবিন তেলে পাম অয়েল মেশানো হচ্ছে বলে আমি মনে করি না। কারণ এ বছর বিশ্ববাজারে সয়াবিন তেলের চেয়ে পাম অয়েলের দাম বেশি। তবে যে কারণেই হোক দেশের বাজারে এখন ভোজ্য তেলের দাম বেড়ে গেছে এবং সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে বাজারে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে এবং দাম বেড়ে গেছে। এতে ভোক্তার যেমন কষ্ট হচ্ছে, আমরা যারা পাইকারি ব্যবসায়ী তাদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।’
তবে বাজার বিশ্লেষক ও ক্যাবের সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসেন মনে করেন, শীতে সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির জন্য পাম অয়েল মেশানোর অভিযোগটি যে একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো না সেটি বোঝা যায় ভোজ্য তেল আমদানির চিত্র দেখেই। কেননা আমাদের দেশে ভোজ্য তেলের বার্ষিক চাহিদা ২৩ থেকে ২৪ লাখ টন। এর মধ্যে ৯০-৯৫ শতাংশই আমদানি করতে হয়। আর আমদানিকৃত ভোজ্য তেলের মধ্যে ৭০ ভাগই হচ্ছে পাম অয়েল আর মাত্র ৩০ ভাগ সয়াবিন। অথচ বাজারে দেখা যায় ৮০ ভাগই সয়াবিন তেল, ২০ ভাগ থাকে পাম অয়েল। তা হলে বাকি ৫০ ভাগ পাম অয়েল কোথায় যাচ্ছে; নিশ্চয় গায়েব হয়ে যায় না। ওইসব পাম অয়েল সয়াবিনের মধ্যে মিশিয়ে সয়াবিন তেল বলে বিক্রি করা হয় বলে আমার মনে হয়। কারণ গরমে পাম অয়েল জমে যায় না, কিন্তু শীতে জমে যায়। যেহেতু সয়াবিন তেলের মধ্যে পাম অয়েল দিলে সেটিও শীতে জমে যায়, এ জন্য শীতকালে ব্যবসায়ীরা পাম অয়েল কম মেশাতে পারেন। আর এতে করে তাদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। মূলত এ কারণেই শীত এলেই প্রতি বছর ভোজ্য তেল ব্যবসায়ীরা কারসাজি শুরু করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে সয়াবিন তেলে পাম অয়েল মেশানোর অভিযোগ ওঠে, তাই সরকারের উচিত বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করা। বিশেষ করে বিএসটিআইকে দিয়ে সরকার বিষয়টি পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে দেখতে পারে।’
বাজার থেকে উধাও সয়াবিন তেল : এদিকে হঠাৎই খোলাবাজারে সয়াবিন তেলের সংকট তৈরি করা হয়েছে। কোম্পানিগুলো কারসাজি করে এমনটি করেছে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। রোজার মাস সামনে রেখে এখন থেকেই সংকট তৈরির চেষ্টা শুরু হয়েছে। সেই পুরোনো চেনাজানা সিন্ডিকেট বাজার থেকে বাড়তি মুনাফা হাতিয়ে নিতে কারসাজি শুরু করেছে। মিল পর্যায় থেকে তেলের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ডিলারের কাছে সরবরাহ কমিয়েছে। এতে ডিলার থেকে খুচরা বাজারে সরবরাহ কমেছে। তাই বাড়তি দামেও চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না খুচরা বিক্রেতারা। এতে বাজার থেকে এক ধরনের উধাওই হয়ে গেছে বোতলজাত সয়াবিন তেল। তেল না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন ভোক্তারা। রাজধানীর বেশ কয়েকটি বাজার ঘুরে ক্রেতা ও ভোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে সয়াবিন তেলের সংকটের বিষয়টি জানা গেছে।
সয়াবিন তেলের এই সংকটে বিপাকে পড়েছেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই। বাজার করতে আসা অনেক ক্রেতা তেল কিনতে এসে খালি হাতেই ফিরছেন। কেউ কেউ সয়াবিন তেল না পেয়ে কিনে নিচ্ছেন রাইস ব্র্যান তেল।
বাজারে খুচরা বিক্রেতারা জানান, সংকট দেখিয়ে এক সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন ও পাম অয়েল লিটারপ্রতি ৫ টাকা বেড়েছে। বর্তমানে খোলা পাম অয়েল ১৬০-১৬২ এবং সয়াবিন ১৭০-১৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর দুয়েকটি দোকানে এক লিটার বোতলজাত সয়াবিন মিললেও বিক্রি হচ্ছে ১৬৭-১৭০ টাকায়। এ ছাড়া দুয়েক জায়গায় এই একই তেল ১৭৫-১৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইলে বিভিন্ন তেল কোম্পানির ডিলাররা জানান, কোম্পানি থেকে আমাদের তেল সরবরাহ করছে না। যেখানে একজন ডিলারের চাহিদা ১০০ কার্টন, সেখানে কোম্পানি ১০-২০ কার্টন তেল দিচ্ছে। এ কারণে বাজারে সরবরাহ কমাতে হচ্ছে।
পাইকারি বাজারে এক সপ্তাহ আগে চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে প্রতি মণ সয়াবিন বিক্রি হয়েছিল ৬ হাজার ৮৭৫ টাকায়। এখন ১০০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার ৯০০ টাকায়। সে হিসাবে প্রতি লিটারে দাম পড়ছে ১৭২ দশমিক ৫০ টাকা। খুচরায় লিটারপ্রতি ৪-৫ টাকা লাভ যোগ করলে বিক্রি করতে হবে ১৭৪-১৭৬ টাকায়। কিন্তু খুচরা বাজারে সরকার ও কোম্পানিগুলোর নির্ধারিত সয়াবিনের লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ মূল্য ১৬৮ দশমিক ৫ টাকা। খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৭৫-১৭৮ টাকার বেশি দরে। একইভাবে আগস্টের প্রথম দিকে পাম অয়েলের মণপ্রতি দাম ছিল ৪ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে। ওই সময়ে সয়াবিনের পাইকারি দাম ছিল মণপ্রতি ৬ হাজার টাকার মতো।
যদিও বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার কারণে তেল সরবরাহ কমেছে বলে দাবি তেল আমদানিকারক ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর। তারা বলছেন, বিশ্ববাজারের হিসাবে লিটারে ১০-১৩ টাকা বেড়েছে। এ জন্য চাহিদার তুলনায় আমদানি কমেছে ২০ শতাংশের মতো। তাই রিফাইনিং করে তেল বাজারে সরবরাহ কম করে দিতে হচ্ছে।
তবে সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে যেসব ভোগ্যপণ্য আমদানি করা হয়, এর প্রায় সবকটির দামই আন্তর্জাতিক বাজারে কমেছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দাম ১০০ থেকে ৭৮ ডলারে নেমে এসেছে। এতে জাহাজ ভাড়াসহ অন্য পরিবহন খরচ কমেছে। দেশে ডলারের দামও কমেছে। আগে আমদানিতে প্রতি ডলার কিনতে হতো সর্বোচ্চ ১৩২ টাকা করে। এখন তা কমে ১২০ টাকায় নেমে এসেছে। এসব কারণে আমদানি খরচ কমেছে। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই আমদানি পণ্যের দাম কমার কথা। কিন্তু বাজারে দাম কমেনি। উল্টো আরও বেড়ে যাচ্ছে।
এ ছাড়া ভোজ্য তেলের সরবরাহ বাড়াতে ও বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভোজ্য তেল আমদানিতে দুই দফায় শুল্ককর কমানো হয়। প্রথম দফায় ১৭ অক্টোবর ও দ্বিতীয় দফায় ১৯ নভেম্বর শুল্ককর কমিয়ে তা নামানো হয়েছে শুধু ৫ শতাংশ। এতে প্রতি লিটার অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম অয়েলে শুল্ককর ১৭-১৮ টাকা থেকে কমে ৭ টাকায় নেমেছে। অর্থাৎ লিটারে শুল্ককর কমেছে ১০-১১ টাকা। অথচ দেশের বাজারে উল্টো দাম বেড়ে যাচ্ছে ভোজ্য তেলের।