শনিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৫, ০৬:২০ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক;মিডিয়া আউটলেট, টেলিভিশন, ওয়েব পোর্টাল, ঘোস্ট রাইটার্স, পিআর ক্যাম্পেইনার, সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত একটি অলআউট ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ফ্যাক্ট চেকাররা। সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো আছেই। এর বিরুদ্ধে যেকোনো প্রতিরোধ নেই তা নয়।
ভারতের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে অ্যাক্টিভিস্টদের একাংশ ব্যক্তিগতভাবে যেমন দেশের পক্ষে এই প্রচারযুদ্ধে শামিল হয়েছেন, তেমনি আবার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগও রয়েছে। ভারতীয় অপতথ্য রুখতে নতুন করেও কিছু উদ্যোগের চেষ্টা চলছে। তবে একে পর্যাপ্ত মনে করছেন না বিশ্লেষকরা। প্রপাগান্ডাকে কীভাবে নিশ্চিহ্ন করা হবে, তা নিয়ে আমাদের জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে যথাযথ উপলব্ধি এবং ধারণা আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। বিশ্লেষকরা বলছেন, সাইবার স্পেসে ভারতীয়দের যেই প্রচারণা যুদ্ধ চলছে, তা কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে এবং এর কৌশলগত জবাব কী হবে, তা নিয়ে সরকারের জরুরি ভিত্তিতে ভাবা উচিত।
৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকেই ভারতের প্রধান ধারার মিডিয়ার একাংশ এবং সে দেশের সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অন্তহীন অপতথ্য ছড়ানো শুরু হয়।
গত কয়েক দিনে এই বাস্তবতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত মঙ্গলবার ইসকনের সাবেক নেতা ও বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের জামিন শুনানি ছিল। এ শুনানির আগের রাতে ২ ডিসেম্বর একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়, আদালতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের হয়ে লড়াই করায় হামলার শিকার হয়েছেন আইনজীবী রমেন রায়। তার বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে এসব প্রতিবেদনে। তবে বাংলাদেশভিত্তিক ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টওয়াচের অনুসন্ধানে দেখা যায়, অ্যাডভোকেট রমেন রায়ের আহত হওয়ার ঘটনাটি গত ২৫ নভেম্বরের। তার বাড়িঘরে হামলার দাবিটিও সত্য নয়। তিনি আইনজীবী, কিন্তু চিন্ময় কৃষ্ণ দাশের আইনজীবী নন।
ফ্যাক্টওয়াচের সঙ্গে সম্পৃক্ত ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) গণমাধ্যম অধ্যয়ন ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সুমন রহমান ভারতীয় অপপ্রচার প্রসঙ্গে সময়ের আলোকে বলেন, বাংলাদেশের এই মূহূর্তে অন্তর্বর্তী সরকার। তারা আসছেন কিছু সংস্কার করে নির্বাচন দেওয়ার জন্য। তাদের তো এটি এজেন্ডাই ছিল না। এ রকম অলআউট প্রচারণা যে চলতে পারে, তা কল্পনাতেই নেই।
ভারতীয় অপতথ্য রুখতে সচেষ্ট বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী অ্যাক্টিভিস্টদের একাংশ। দীর্ঘদিন থেকে হাসিনা সরকারের অপতথ্যের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টির কাজ করছেন হুমায়ূন কবীর।
সম্প্রতি তিনি ঘোষণা দিয়েছেন এক্সে আরও সরব হচ্ছেন ভারতীয় অপতথ্য রুখতে।
শাফকাত রাব্বী অনীক নামের একজন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শিক্ষক জনগণের টাকায় একটি ইংরেজি ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল খোলার উদ্যোগ এগিয়ে নিচ্ছেন ভারতীয় অপপ্রচার রুখতে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকেও অপতথ্য মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। সঙ্গে রয়েছে এএফপি, রিউমার স্ক্যানার ও ডিসমিস ল্যাবের মতো কিছু ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান। তবে এসব প্রচেষ্টাকে পর্যাপ্ত মনে করছেন না বিশ্লেষকরা।
সুমন রহমান সময়ের আলোকে বলেছেন, এই অপতথ্যের ক্যাম্পেইন থেকে মুক্তি নেই। এখন সরকারের মুখপাত্ররা বিভিন্ন জায়গায় বলছেন। টেলিভিশন, সংবাদপত্রগুলো সচেতন হচ্ছে। এখন একটি সচেতন হওয়ার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছি। কিন্তু পদ্ধতিগতভাবে অপতথ্য রোধে যে অর্গানাইজড ফোর্স গঠন, সেটি আমরা এখনও দেখতে পাচ্ছি না। এ জন্য বাংলাদেশে একটি ‘ট্রুথ ক্যাম্পেইন’ করতে হবে।
এর আগে কলকাতায় বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনের সামনে জাতীয় পতাকা পোড়ানো এবং আগরতলায় সহকারী হাইকমিশনে হামলা ও ভাঙচুরের মতো উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ছবিটিতে দেখা যায়, বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে পাঞ্জাবি ও টুপি পরিহিত এক ব্যক্তি ভারতের জাতীয় পতাকা পায়ে মাড়াচ্ছেন। কিন্তু বাংলাদেশভিত্তিক রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতের জাতীয় পতাকা পায়ে মাড়ানোর ভাইরাল ছবিটি বাস্তব নয় বরং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।
এ ছাড়াও আগরতলার ঘটনার প্রেক্ষিতে বাংলাদেশিরা ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন ভবনের সামনে বিক্ষোভ করেছে এবং তারা ভারতীয় কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে ভবনে ঢোকার চেষ্টা করেছে দাবিতে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়। কিন্তু রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রচারিত ছবিটি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন ভবনের সামনে বিক্ষোভ এবং ভারতীয় কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার নয় বরং ভিন্ন ঘটনার।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ২০২৪ বৈশ্বিক ঝুঁকি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মিথ্যা তথ্য (ডিসইনফরমেশন) এবং ভ্রান্ত তথ্য (মিসইনফরমেশন) ভারতে বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩৪টি সম্ভাব্য ঝুঁকিযুক্ত দেশের মধ্যে ভারত রয়েছে শীর্ষস্থানে। সংক্রমণজনিত রোগ, অবৈধ অর্থনৈতিক কার্যক্রম, অর্থনৈতিক অসমতা এবং শ্রম সংকটের মতো বিষয়গুলোকেও এই ঝুঁকি ছাড়িয়ে গেছে।
ভারতীয় অপপ্রচার মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ সময়ের আলোকে বলেন, প্রচার যুদ্ধে ভারতের যা প্রস্তুতি, তার এক হাজার ভাগের এক ভাগও আমাদের নেই। ভারত এর আগে পাকিস্তানকে মোকাবিলা করার জন্য প্রায় ৩০ থেকে ৪০ বিলিয়ন ডলারের ‘প্রচারযুদ্ধ’ ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করেছে। এই প্রচারযুদ্ধ পাকিস্তান বদলিয়ে কিছুদিন মালদ্বীপের বিরুদ্ধে ছিল। এখন বাংলাদেশের দিকে পুরোপুরি চালু করেছে। ভারত প্রচারযুদ্ধ শুরু করেছে। আমরা কোনো যুদ্ধ ঘোষণা করিনি। যুদ্ধের কথা বললে ভুল বার্তা যাবে। মনে হবে মেলা কিছু করছি। আসলে তো কিছু করছি না। পিআইবি কিছু করছে কি না প্রশ্নের উত্তরে বলেন, পিআইবি সাধারণ সাংবাদিকদের ট্রেনিং ও গবেষণামূলক কাজ করে। আমরা কিছু করলে সামনে করব। এখনও শুরু করিনি।
অপপ্রচার রোধে কী করা যেতে পারে প্রশ্নের উত্তরে সুমন রহমান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে সব মানুষ যেমন এক হয়ে গিয়েছিল, একেকজন মানুষ যেমন একেকজন এজেন্ট হয়ে গিয়েছিল, এখানেও এক হয়ে যেতে হবে। কেন্দ্র থেকে পরিচালনা করার কিছুই নেই। মানুষের মধ্যে এক ধরনের সচেতনতা দেখা যাচ্ছে। তাদের এখন একটু নির্দেশনা এবং প্রেরণা দিতে হবে।
অপপ্রচার রোধে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নন এএফপি বাংলাদেশের ফ্যাক্ট চেকার কদরুদ্দিন শিশির। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, অপপ্রচার মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতি পর্যাপ্ত না। আমাদের বুঝতে হবে, ভারত থেকে সমন্বিত ক্যাম্পেইন হচ্ছে। এটি মোকাবিলায় সমন্বিত প্রচেষ্টা দরকার। সরকার, রাজনৈতিক দল, সংবাদমাধ্যম, ফ্যাক্ট চেকার যারা আছেন, সব মিলিয়েই সমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। যেটি এখানে অনুপস্থিত।
সমন্বিত পদক্ষেপ কীভাবে হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে শিশির বলেন, প্রথমত ফ্যাক্ট চেকাররা যেসব কনটেন্ট ফ্যাক্ট চেক করে, সেগুলো মিডিয়াতে প্রচার করতে হবে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও ম্যানপাওয়ারের অভাবে ফ্যাক্ট চেকাররা অনেক কিছুই করতে পারে না, যেটি মিডিয়া করতে পারে। মিডিয়া নিজে অথবা আপদের সময়ের জন্য ফ্যাক্ট চেকার রাখতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশেই এটি হয়েছে। এখানে সরকার সাহায্য করতে পারে। বেসরকারি সংস্থাগুলো সাহায্য করতে পারে।
প্রচারযুদ্ধে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আ-আল মামুন সময়ের আলোকে বলেন, আমাদের কোনো প্রস্তুতি নেই। সমন্বয়ও নেই, তাই প্রস্তুতিও মিনিমাম। যেটি দিয়ে কিছুই হয় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি বলা উচিত সেটি হচ্ছে, এখন বিশ্ব চলছে পপুলার ডিসকোর্স দিয়ে। বিশেষ করে তথ্যের ম্যানুপুলেশন ও তথ্যের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ খুবই বাজেভাবে ফেল করেছে গত কয়েক মাসে। সরকারের জরুরি ভিত্তিতে এটি নিয়ে ভাবা উচিত, যেই প্রপাগান্ডা ওয়ার চলছে, তা কীভাবে মোকাবিলা করবে। এর সিস্টেমেটিক রেসপন্স কীভাবে হবে।
আ-আল মামুন বলেন, আপনাকে অ্যানালাইসিস হাজির করতে হবে প্রপাগান্ডার বিরুদ্ধে এবং বিশ্ব মিডিয়ায়ও এটি দিতে হবে। একই সঙ্গে যারা এগুলো ছড়াচ্ছে তাদের ব্যাপারে জানতে পড়াশোনা করতে হবে। এখানে সমন্বয়, গবেষণা এবং কৌশলের আমার ধারণা মারাত্মক ভুল থাকছে। প্রপাগান্ডাকে কীভাবে কিল করব, সে বিষয়ে আমাদের যথাযথ উপলব্ধি এবং ধারণা আছে বলে আমার মনে হচ্ছে না।
তবে আশার জায়গাও দেখছেন অধ্যাপক মামুন। তিনি বলেন, মানুষ যেভাবে ভারতের আধিপত্য বাংলাদেশে দেখেছে, এর ফলে আওয়ামী লীগ, ভারতের সরকার কিংবা গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ যাই করুক না কেন, মানুষ দিন দিন ম্যাচিউরড হচ্ছে।